দশই মুহাররম পবিত্র আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব, ফজিলত এবং আশুরার রোজার নিয়মাবলী

 দশই মুহাররম পবিত্র আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব, ফজিলত এবং আশুরার রোজার নিয়মাবলী

                                                                                                       -শেখ মুহাম্মাদ রমজান হোসেন

٣٦- إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّـهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّـهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ ۚ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّـهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ 

 নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে,(সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এরমধ্যে থেকে চারটি সম্মানিত,এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন জুলুম করো না। (সূরা তাওবা/৩৬)

 “ The number of months In the sight of Allah Is twelve (in a year)— So ordained by Him The day He created The heavens and the earth; Of them four are sacred: That is the straight usage. So wrong not yourselves Therein, and fight the Pagans All together as they Fight you all together. But know that Allah Is with those who restrain Themselves”.( Sūrah 9: Taubah, Ayat:36,Verses 129 — Madani; Revealed at Madina — Sections 16).

সহিহ-বুখারিতে পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত  চারটি মাস বলতে ১. মুহাররম,২. রজব,৩. জিলকদ এবং ৪. জিলহজ মাসকে বুঝানো হয়েছে। (বুখারি.২৯৫৮)

পবিত্র আশুরার গুরুত্বঃ

 .স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলে অভিহিত করেছেন তার মধ্যে মুহাররম একটি। (সূরা তাওবা/৩৬)

.পবিত্র হাদিসে এ মাসটিকে আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করা হয়েছে। (মুসলিম/১৯৮২)

.বারটি মাসের মধ্যে এ মাসটি (মুহররম) সর্বপ্রথম। (বুখারি/২৯৫৮)

.এ মাসের মধ্যে এমন একটি দিন আছে যাকে আশুরার দিন বলা হয়। যে দিনটিতে রোজা রাখলে বিগত এক বছরের পাপরাশি মোচন হয়। (মুসলিম/১৯৭৬). এ দিনকে রাসূল (সা.) ইয়াওমু ছছালিহ; ইয়াওমুল আযিম; বলে অভিহিত করেছেন। (বুখারি/১৮৬৫)।                      

দশই মুহাররম পবিত্র আশুরার ইতিহাস

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে দেখতে পেলেনইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) বললেন, এটি কী? তারা বললএটি একটি ভালো দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে বাঁচিয়েছেন। তাই মুসা (আ.) রোজা পালন করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লামের বললেন, মুসা (আ.)-কে অনুসরণের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। অতঃপর তিনি রোজা রেখেছেন এবং সাওম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৬৫)

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, ‘এটি সেই দিন, যেদিন নুহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পর্বতে স্থির হয়েছিল, তাই নুহ (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য সেদিন রোজা রেখেছিলেন। ’ (হাদিস : ৮৭১৭)

আশুরার রোজার মর্যাদা : আশুরার রোজার প্রচলন ইসলাম আগমনের আগেও জাহেলি সমাজে প্রচলিত ছিল। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছেতিনি বলেন, ‘জাহেলি যুগের লোকেরা আশুরার রোজা বা সাওম পালন করত। ’ (তুহফাতুল আশরাফহাদিস : ১২৭৩৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং অন্যকেও উৎসাহিত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমি নবী (সা.)-কে রোজা রাখার এত বেশি আগ্রহী হতে দেখিনি,যত দেখেছি এ আশুরার দিন এবং এ মাস (রমজান) মাসের রোজার প্রতি। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আশুরার দিনের সাওমের ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৬)

আশুরার রোজা কিভাবে রাখব : ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহামাদ, ইমাম ইসহাক প্রমুখ বলেছেন, আশুরার রোজার ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের রোজাই মুস্তাহাব। কেননা নবী (সা.) ১০ তারিখ রোজা রেখেছেন আর ৯ তারিখ রোজা রাখার নিয়ত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখলেন এবং (অন্যদের) সাওম রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এটি তো এমন দিন, যাকে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বড় জ্ঞান করে, সম্মান জানায়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আগামী বছর এই দিন এলে আমরা নবম দিনও রোজা রাখব ইনশাআল্লাহ। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৪৬)

এই হচ্ছে পবিত্র আশুরার মূসা আলাইহিমুস সালাম কেন্দ্রিক ইসলামের প্রথম ইতিহাস 

দ্বিতীয় ইতিহাস হচ্ছে শহীদে কারবালা কেন্দ্রিক এতে যদিও আশুরার রোজার কোন সম্পর্ক নেই তবে আশেকে আহলে বাইতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ১০ মুহররম আহলে বাইতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ইশক এবং মুহব্বাত প্রকাশের এক অনন্য শ্রেষ্ঠ দিন,দিবস যা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ গভীর দীনী ভাবাবেগের মাধ্যমে প্রতি বছর দশই মুহররম সিয়াম বা রোজা পালনের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকেন।

উল্লেখ্য, দশই মুহররম ৬০ হিজরী মোতাবেক ৬৮০ ঈসাব্দে ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় খলিফা ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার প্রধান সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ পরিচালিত এক অসম যুদ্ধে হজরত মুহাম্মদের(স.)এর কলিজার টুকরা প্রিয় নাতি হজরত হুসাইন ইবনে আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু পরিবারসহ ৭০ জন মতান্তরে ৭২ জন অনুসারী শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

মোহর্‌রম

কাজী নজরুল ইসলাম---অগ্নিবীণা

নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,–
‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’।
কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !
উন্‌মাদ ‘দুলদুল্’ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আলি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়!
মা ফাতেমা আস্‌মানে কাঁদে খুলি কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস!
রণে যায় কাসিম্ ঐ দু’ঘড়ির নওশা,
মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা!
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা–
‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেলো সকিনা!’
কাঁদে কে রে কোলে করে কাসিমের কাটা-শির?
খান্‌খান্ খুন হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর!
কেঁদে গেছে থামি হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র!
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
‘আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!’
নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার!
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্‌মনও ‘সাব্বাস’!
দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা!’
মা’র থনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্‌পায়!
জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়্‌টায়?
দাউদাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু–’পানি দাও, মরে জাদু আস্‌গর!’
কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,
খাঁ খাঁ করে কার্‌বালা, নাই পানি খর্জুর,
পেল না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা, –পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!
পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে!
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
‘দাদা! তেরি হর্ কিয়া বর্‌বাদ্ পয়মাল!’
হাইদরি-হাঁক হাঁকি দুল্‌দুল্-আস্‌ওয়ার
শম্‌শের চম্‌কায় দুশমনে ত্রাস্‌বার!
খসে পড়ে হাত হতে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার।
নিঃশেষ দুশ্‌মন্; ওকে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মুছে আঁখি-প্রান্ত?
কোথা বাবা আস্‌গর্? শোকে বুক-ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসনের ফেটে যায় পাঁজরা!
ধুঁকে ম’লো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্‌জাত্‌রা!
অঞ্জলি হতে পানি পড়ে গেল ঝর্-ঝর্
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর!
হল্‌কুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে?–
আফ্‌তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে!
আস্‌মান ভরে গেল গোধূলিতে দুপরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে!
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্–
‘আরশের পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা,
‘এয়্ খোদা বদ্‌লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জনা করো গোনা পাপী কম্‌বখ্‌তের!’
কত মোহর্‌রম্ এল্ গেল চলে বহু কাল–
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুস্‌লিম্! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,
‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজ সেই মোহর্‌রম মাহিনা,–
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!
উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবির,
দুনিয়াতে নত নয় মুস্‌লিম কারো শির;–
তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,
শম্‌শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য,
হুশিয়ার ইস্‌লাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো ওঠো মুস্‌লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।
শহীদের দিনে সব-লালে-লাল হয়ে যাক!
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস দিন।
হাসানের মতো পি’ব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের;
আস্‌গর সম দিব বাচ্চারে কোর্‌বান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান!
সকিনার শ্বেতবাস দেব মাতা কন্যায়,
কাসিমের মতো দেবো জান রুধি অন্যায়!
মোহর্‌রম্! কারবালা! কাঁদো ‘হায় হোসেনা!’
দেখো মরু-সূর্যে এ খুন যেন শোষে না!



Comments

Popular posts from this blog

মুসলিম শিশু ছেলেদের জন্য সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু আনহুদের অর্থপূর্ণ নামের তালিকা

সন্তান জন্মের পর যে কাজগুলো সুন্নত-ই-রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম