‘আউয়াবিন’:যে নামাযে সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ গোনাহ মাফ হয়/ইশরাকঃ যে নামাযে একটি হজ এবং একটি ওমরাহর সাওয়াব

 প্রশ্ন : আওয়াবিন নামাজের সময় মাগরিবের সুন্নতের পর নাকি মাগরিবের দুই রাকাত নফল নামাজের পর? এতে কি কোনো বিশেষ সূরাহ আছে?

রোজা ভুঁইয়া, জার্মানি

উত্তর : কিছু ওলামায়ে কেরামের মতে ফরজের পরই আওয়াবিনের সময় শুরু হয়। অতএবদুই রাকাত সুন্নতসহ সর্বমোট ছয় রাকাত পড়ার দ্বারা আওয়াবিন পড়ার সওয়াব অবশ্যই পেয়ে যাবে। তবে দুই রাকাত সুন্নত পড়ার পর ছয় রাকাত আওয়াবিন পড়াই শ্রেয়। আওয়াবিন নামাজে পড়ার বিশেষ কোনো সুরা নেই। (মাজমাউল আনহুর : ১/১৯৫, তিরমিজি, হাদিস : ৪৩৫, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ৩/১৫৫)

সমাধান: ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা https://www.kalerkantho.com/print-edition/islamic-life/2020/09/16/955777

আউয়াবিন নামাযের ওয়াক্ত

আউয়াবিন নামাযের ওয়াক্ত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,যখন নামাজি মাগরিবের নামাজ পড়ে শেষ করে এবং এর ওয়াক্ত ইশার ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত থাকে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)

আউয়াবিন নামাজের ফজিলত

হাদিসে কুদসিতে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন: আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার কাছাকাছি হয়। এক পর্যায়ে সে আমার প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। (বুখারি)

আউয়াবিন:যে নামাজে সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ গোনাহ মাফ হয়

হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,মাগরিবের নামাজের পর যে ব্যক্তি ছয় রাকাআত নফল নামাজ পড়বে তার গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবেযদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। (মাজমাউজ জাওয়াইদ)

ফরজ নামাজ ছাড়াও এমন একটি নফল নামাজ আছে; যে নামাজকে আল্লাহভিরুদের নামাজ বলা হয়।  এ নামাজ সম্পর্কে হাদিসের কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। তাহলো-

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ফেরেশতারা ঐসকল লোকদের ঢেকে নেয়যারা মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নামাজ পড়ে।।’ (শরহুস সুন্নাহবাগাবি : ৮৯২)

আম্মার ইবনে ইয়াজিদের ছেলে মোহাম্মদ ইবনে আম্মার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার পিতা আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে (রা.) বলতেন, আমি আমার প্রিয় মোহাম্মাদ (সা.)-কে দেখেছি, তিনি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়তেন।’ (আল মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানি : ২৭৪৫)।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও বলেছেন, নবীজি (সা.) এ নামাজ পড়েছেন।’ (কিয়ামুল লাইল : ৮৮)। হুজায়ফা (রা.) বলেন,‘আমি নবীজির (সা.) কাছে এসে তাঁর সঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। তিনি মাগরিবের পরে এশার নামাজ পর্যন্ত নফল নামাজে রত থাকলেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২/১৫)।

আনাস (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নফল নামাজ পড়তেন’ (নাইলুল আওতার : ৩/৫৪) আনাস (রা.) থেকেই অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) অনেক সময় মাগরিবের নামাজ পড়ে নফল নামাজ পড়তেন, এমনকি কখনো এশার নামাজের আজান হয়ে যেত।’ (কাসফুল গুম্মাহ : ১১২)

মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ের নফল নামাযের সময়কালঃ- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনমাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ের নফল নামাযের ওয়াক্ত ওই সময় থেকে শুরু হয়যখন নামাজি মাগরিবের নামাজ পড়ে শেষ করে এবং এর ওয়াক্ত ইশার ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত থাকে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)

আওয়াবিন নামাজ কয় রাকাত : এই নামাজ কমপক্ষে ছয় রাকাত এবং সর্বাপেক্ষা বিশ রাকাত নফল নামাজ। ছয় রাকাত পড়ারও সুযোগ না হলে মাগরিবের দুই রাকাত সুন্নত মিলিয়ে ছয় রাকাত পড়া যায়। নবীজি (সা.) কখনো ৬ রাকাত (তিরমিজি) কখনো ৪ রাকাত (নাইলুল আওতার) কখনো ১২ রাকাত (ইতহাফুস সাদাহ : ৩/৩৭১) আবার কখনো বা ২০ রাকাত (তিরমিজি : ৪৩৫) নফল নামাজ পড়তেন। তবে ৬ রাকাতই অধিকাংশ সময় পড়তেন।

ইশরাকের নামাজ কখন কত রাকাআত পড়তে হয়?

হজরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনযে ব্যক্তি ফজর নামাজ জামাআতে আদায় করার পর সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত ওখানে বসে বসেই আল্লাহর জিকির করে। তারপর দুই রাকাআত নামাজ আদায় করে। তার জন্য পূর্ণাঙ্গ হজ ও ওমরার সমান সাওয়াব রয়েছে। (তিরমিজি, মিশকাত)

সালাতুল ইশরাক বা ইশরাকের নামাজ। নফল এ নামাজ বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে পড়তেন এবং অন্যকে পড়তেও বলতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ নামাজ পড়তেন না বরং একটু সময় নিয়ে আদায় করতেন।

সূর্য উঠার পর জগত আলোকিত হয় বলে এ সময় হাদিসে যে নামাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায়মুহাদ্দিসিনে কেরামগণ তাকে সালাতুল ইশরাক বলেছেন। ইশরাক শব্দের অর্থ হলো আলোকিত হওয়া।

 সালাতুল ইশরাকের ফজিলাত

এ নফল নামাজের ফজিলত বর্ণনায় একাধিক হাদিসে এসেছে-
হজরত আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেনরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনএক নামাজের পর (ধারাবাহিক) আর এক নামাজযার মাঝখানে কোনো গোনাহ হয়নিতা ইল্লিয়্যুন (উচ্চ মর্যাদায়) লেখা হয়।
 (আবু দাউদ)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,যে ব্যক্তি জামাআতের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়ল। অতপর সূর্য উঠা পর্যন্ত সেখানে বসে আল্লাহর জিকির করলঅতপর দাঁড়িয়ে দুই রাকাআত নামাজ পড়ল; সে একটি হজ ও ওমরাহ করার সাওয়াব নিয়ে ফিরে গেল। (তাবারানি, আত-তারগিব)

সূর্য উঠার আগে আল্লাহর জিকির, তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা আমার কাছে ইসমাঈল বংশের দুইজন গোলাম আজাদ করার চেয়েও অধিক প্রিয়। (মুসনাদে আহামদ)
সালাতুল ইশরাকের সময়
ফজর নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সূর্য উঠার পর  ইশরাক নামাজ আদায় করতে হয়। কেউ কেউ বলেছেন সূর্য উঠার ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর; আবার কেউ কেউ বলেছেন ২৩ থেকে ২৫ মিনিট পর এ নামাজ পড়তে হয়। আর সূর্য এক বর্শা পরিমাণ (দেড় মিটারের মতো) মধ্যাকাশের দিকে উঠা পর্যন্ত ইশরাকের নামাজের ওয়াক্ত থাকে।

ইশরাক নামাজ পড়ার নিয়ম

ইশরাক নফল নামাজ। এটি অন্যান্য নামাজের মতোই দুই রাকাআত করে আদায় করতে হয়। ইশরাকের নামাজের জন্য সুস্পষ্ট আলাদা কোনো সূরাহ ক্বিরাত নেই।

Comments

Popular posts from this blog

মুসলিম শিশু ছেলেদের জন্য সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু আনহুদের অর্থপূর্ণ নামের তালিকা

সন্তান জন্মের পর যে কাজগুলো সুন্নত-ই-রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

দশই মুহাররম পবিত্র আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব, ফজিলত এবং আশুরার রোজার নিয়মাবলী